অন্ধকার ফ্লাইওভারে ঝুঁকিতে জানমাল

সংবাদ

সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত অন্ধকারে ছেয়ে থাকে রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর উদ্বোধনের মাধ্যমে যান চলাচলের জন্য ফ্লাইওভারটি খুলে দেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে ফ্লাইওভারে বাতিও আর জ্বলেনি। ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৮ সালে ৮ নভেম্বর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এরপর দুই বছর অতিবাহিত হলেও কোনো সিটি করপোরেশন ফ্লাইওভারে সড়কবাতি জ্বালাতে পারেনি। এতে ফ্লাইওভারে যানবাহন চলছে ঝুঁকি নিয়ে। দুর্ঘটনা ছাড়াও আছে ছিনতাইকারীদের হাতে জানমাল খোয়ানোর ঝুঁকি।

সরেজমিনে দেখা যায়, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া হয়ে শান্তিনগর অংশে ফ্লাইওভারের দুটি বাঁক খুব বিপজ্জনক। প্রথমটি হলো মালিবাগ থেকে উঠতে শাহজানপুর-শান্তিনগর দিকে যেতে। দ্বিতীয়টি শান্তিনগরের দিকে যেতে। পরিবহনগুলো যে গতিতে উঠে তাতে দুটি বাঁকে দ্রুত ‘গতি’ কমাতে হয়। গতি না কমালে দেখা দেয় বিপত্তি। ‘সামনে বাঁক’ লেখা কোনো নির্দেশনাও দেখা যায়নি। এই বাঁকের কারণে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া একটি বাতিও জ্বলতে দেখা যায়নি। ফ্লাইওভারের দুই পাশে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। এর সঙ্গে কোথাও কোথাও জমেছে বালুর স্তূপ। এতে স্লিপ কেটে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা। এ ছাড়া মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের মগবাজার, হলি ফ্যামিলি, শান্তিনগর, সাতরাস্তা ও কারওয়ান বাজার অংশটুকু অন্ধকার দেখা যায়।

এ বিষয়ে মোটরসাইকেল চালক মো. রুবেল প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, সন্ধ্যার পর ফ্লাইওভারের কোনো অংশেই জ্বলে না বাতি। রাতে অন্ধকারে ঘটে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। বিশেষ করে ছিনতাই এখানকার দৈনিক ঘটনা। ফ্লাইওভারে আলো না থাকায় দ্বিমুখী চলাচলে যানবাহনের হেডলাইটের আলোয় চালকদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, একটি বড় বাজেটের প্রকল্প মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। এত বড় বাজেটের প্রকল্প অন্ধকারে থাকে, তা সরকারের উদাসীনতা। এর অন্যতম কারণ সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাও। তাই সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করা। তিনি আরো জানান, যত দ্রুত সম্ভব ফ্লাইওভারটি বৈদ্যুতিক বাতি লাগিয়ে আলোকিত করা উচিত। সিগন্যাল বাতিগুলো সচল করা দরকার।

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয় মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার। তখন রাত হলেই আলোয় ঝলমল করত ফ্লাইওভারটি। কিন্তু কয়েক দিন না যেতেই পুরো ফ্লাইওভার জুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। তিন দফা বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২ মার্চ তার চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর আর বিদ্যুতের তার স্থাপন করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ কারণে এখন সন্ধ্যা হলেই ফ্লাইওভারটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে থাকে। গাড়ির নিজস্ব লাইট দিয়ে চলাচল করতে হয়। সম্প্রতি এ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে এক মোটরসাইকেল চালককে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

ফ্লাইওভারের মৌচাক অংশের দুটি স্থানে পাঁচটি ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি লাগানো হয়েছিল। তার চুরির আগে সেগুলোতে আলো জ্বলতে দেখা গেছে। সিগন্যাল মোতাবেক যানবাহন চলাচলও করেছে। তার চুরির পর চার লেনের মৌচাক অংশে যানবাহন চলছে নিজেদের মতো করে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, এলজিইডি ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে কে থাকবে, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এক বছর অভিভাবকহীন থাকে ফ্লাইওভারটি। পরে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ফ্লাইওভারটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয় এলজিইডি। কিন্তু কাগজে-কলমে বুঝিয়ে দিলেও আর্থিক বরাদ্দ না থাকায় এত দিন সিটি করপোরেশন এর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। ফ্লাইওভারটির ওপরে ধুলা, ময়লা এমনকি কোনো কোনো স্থানে এখন ঘাসও জন্ম নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ডিএসসিসিকে পুরো ফ্লাইওভারের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। তারা সে অনুসারে ২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করেছে। এ প্রকল্পের প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অনুমোদনের পর এখন পরিকল্পনা কমিশনের মতামতের অপেক্ষায় আছে।

এ প্রকল্পের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক) কাজী মো. বোরহান উদ্দিন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। এখন সংশোধনের কাজ চলছে। তবে এর আগে কয়েকবার পাঠানো হয়েছিল। তারা ডিপিপি সংশোধন ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ফেরত পাঠিয়েছে। তবে আশা করছি, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে পারব।’

এলজিইডি প্রায় ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। সব মিলিয়ে ৮ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এ ফ্লাইওভারের তিনটি অংশ আছে। একটি অংশ সাতরাস্তা থেকে কারওয়ান বাজার হয়ে মগবাজার-হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত। আরেকটি অংশ শান্তিনগর-মৌচাক হয়ে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া পর্যন্ত আর শেষ অংশটি বাংলামোটর-মগবাজার হয়ে মৌচাক পর্যন্ত। এর নির্মাণকাজ করে ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও নাভানার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘সিমপ্লেক্স নাভানা জেভি’ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান এমসিসিসি ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.