‘চোখ রাঙাচ্ছে’ পদ্মা

ভিন্ন খবর

Day

Night


উজান থেকে নেমে আসা পানিতে এবার নতুন করে ফুঁসে উঠছে পদ্মা। ফলে মধ্যাঞ্চলে বন্যার শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে ওই এলাকার মানুষ। গতকাল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। প্রবল স্রোত আর ঘূর্ণাবর্তে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলছে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে। এদিকে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে যমুনা এখনো উত্তাল। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর পয়েন্টে গতকালও যমুনার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। যমুনাবেষ্টিত উত্তরের জেলাগুলোতে অবনতি হলেও তিস্তাবেষ্টিত জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। তবে সেখানে বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা। উত্তরের কয়েকটি জেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ। এতে সীমাহীন কষ্টে রয়েছে তারা। এদিকে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও ঘাঘট নদীর পানি বাড়ছেই। এসব নদীর পানিও বিভিন্ন পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি একদিকে উন্নতি হলেও অন্যদিকে অবনতি হচ্ছে। বন্যায় সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লায় খামারিদের এক হাজার ১৯৩টি পুকুরের প্রায় ৩০ কোটি টাকার মাছ ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুর্গত মানুষের মাঝে যে পরিমাণ ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে।এদিকে উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।এ ব্যাপারে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পানি বেড়ে বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এদিকে উপজেলার নদী তীরবর্তী দৌলতদিয়া ইউনিয়নের কুশাহাটা, যদু মাতবরপাড়া, নতুনপাড়া, হাতেম মণ্ডলপাড়া, লালু মণ্ডলপাড়া, ইদ্রিসপাড়া, মালতপাড়া, জয়দার মণ্ডলপাড়া, ২ নম্বর বেপারীপাড়া, বাহিরচর গ্রাম, দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা, রাখালগাছি, মধু সরদারপাড়া, জলির মুন্সিরপাড়া ও কাউয়ালজানি গ্রাম এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের কাঠের তৈরি পথচারী সেতুর একাংশ পানিতে তলিয়ে গেছে।

মুন্সীগঞ্জ : উজান থেকে ধেয়ে আসছে পানি। ফুঁসে উঠছে পদ্মা। প্রবল স্রোত আর ঘূর্ণাবর্তে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলছে। স্রোতের প্রতিকূলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ফেরি চলছে সীমিত আকারে। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে ফেরি চলাচল। সীমিত আকারে ফেরি চলায় ঘাটে দেখা দিয়েছে যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পারাপারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীবাহীসহ বিভিন্ন ধরনের সাড়ে পাঁচ শতাধিক যানবাহন।

বিআইডাব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের মেরিন ম্যানেজার আহমেদ আলী জানান, তিনটি রো রো, তিনটি কে টাইপসহ মোট সাতটি ফেরি দিয়ে এখন নৌপথ সচল রাখা হয়েছে।

ধুনট (বগুড়া) : বগুড়ার ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর পানি গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বিপত্সীমার ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বাড়তে থাকায় প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) : কাজিপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার কাজিপুর পয়েন্টে পানি বেড়ে বিপত্সীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন করে আরো বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। শুভগাছা ইউনিয়নের বীরশুভগাছায় এ বছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্মিত সেতুটি বন্যার পানির তোড়ে দেবে গেছে। সেতুটির পাশের পুরনো ওয়াপদা বাঁধেও ধস নেমেছে।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বাড়ছেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ৮০ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমার ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে নতুন করে করতোয়া নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ৫০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি সাঘাটার চর, নিম্নাঞ্চলসহ মোট ১৯টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। ব্যাপক এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। গাইবান্ধা শহরের নতুন ব্রিজ থেকে ডেভিড কমপানিপাড়ার আগের বাড়ি পর্যন্ত শহর রক্ষা বাঁধের চারটি পয়েন্টে ফুটো দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে। বাঁধের গোড়ার মাটিও ধসে যাচ্ছে। ফলে শহর রক্ষা বাঁধটি এখন হুমকির মুখে।

কুড়িগ্রাম : নদ-নদীর পানি সামান্য কমলেও কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ধরলার পানি বিপত্সীমার ৬১ ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এরই মধ্যে ৫৫টি ইউনিয়নের ৩৫৭টি গ্রামের দুই লাখ মানুষ পানিবিন্দ হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার প্রায় ছয় হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।

নীলফামারী : নীলফামারীতে তিস্তার বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপত্সীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, ‘তিন দিনের বন্যায় উপজেলায় তিন হাজার ২২০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীভাঙনের শিকার হয়েছে ৬৯টি পরিবার।’

হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) : হাতীবান্ধায় কমতে শুরু করেছে তিস্তার পানি। তবে নদীভাঙনের কারণে কয়েক দিনে ফসলি জমিসহ শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রাণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফেরদৌস আলম বলেন, ‘আমরা ফকিরপাড়া ইউনিয়ের ৯টি নদীভাঙন পরিবারের খবর পেয়েছি।’

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির একদিকে উন্নতি অন্যদিকে অবনতি হচ্ছে। পানি কমছে জেলার প্রধান নদী সুরমার। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পুরাতন সুরমায় পানি বেড়েছে। পুরাতন সুরমার দিরাই পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দিরাই-শাল্লার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি নতুন করে ডুবে যাচ্ছে। তবে বন্যায় খামারিদের এক হাজার ১৯৩টি পুকুরের প্রায় ৩০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গতকাল পানি বেড়েছে নলুয়া হাওরবেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের ভুরাখালি, দাসনাও, হরিণাকান্দি গ্রামে। এসব গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল জগন্নাথপুর-চিলাউড়া সড়কের পৌর এলাকার যাত্রাপাশা এলাকার কিছু অংশে পানি উঠেছে। শেরপুর এলাকায় ২০ থেকে ২৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে।

মধ্যাঞ্চলে বন্যার অবনতি হতে পারে : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা একই থাকতে পারে। মেঘনা অববাহিকার নদীগুলোর পানিও কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টায় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বাড়ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মা নদী মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূল পয়েন্টে বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর মানিকগঞ্জের আরিচা অংশেও পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। সূত্রঃ কালের কণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.