পুরুষ ও মহিলার নামাযের পার্থক্য

আমাদের ইসলাম মাসায়েল শিক্ষা হক কথা

আল্লাহ তাআলা মানব জাতীকে বিশেষ হেকমতের কারণে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন নারী ও পুরুষ । আর উভয়ের মাঝে শারীরিক গঠন-আকৃতি, শক্তি-সামর্থ্য, স্বভাব-চরিত্র, নিরাপত্তা, সতর ও পর্দা সহ অনেক বিষয়েই বেশ পার্থক্য বিদ্যমান। আর এ বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য রেখে ইসলামী শরীয়তও বিভিন্ন মাসআলা ও ইবাদাত বন্দেগীর পদ্ধতিতে নারী-পুরুষগত পার্থক্য বহাল রেখেছে। যেমন-
১। মহিলাদের জন্য নাপাকী অবস্থায় রোযা রাখা নিষেধ। তাদের এ রোযাগুলো পরে ক্বাযা করতে হয়। অথচ পুরুষেরা তাদের মত নাপাকই হয় না।
২। খোরপোষের দায়িত্ব পুরুষের উপর বর্তায়। অথচ (পুরুষ থাকা অবস্থায়) মহিলাদের উপর কখনো খোরপোষের দায়িত্ব আসে না।
৩। তালাক প্রদানের অধিকার এককভাবে পুরুষের অথচ মহিলা কখনো স্বামীকে তালাক দিতে পারে না।
৪। পুরুষেরা একসাথে চারটি পর্যন্ত বিবাহ করতে পারে। কিন্তু মহিলারা এক সাথে একাধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।
৫। পুরুষ হজ ফরজ হলেই একা হজ করতে পারে। কিন্তু মহিলারা মাহরাম পুরুষ ব্যতীত হজে যেতে পারে না।
৬। হজ পালনের সময় পুরুষেরা উচ্চ আওয়াজে তালবিয়া পাঠ করে। অথচ মহিলাদের জন্য নিম্নস্বরে পড়া জরুরী।
অনুরূপভাবে নামাযের বেশ কিছু হুকুম-আহকামেও পুরুষ ও মহিলাদের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। যেমন-
১। মহিলাদের প্রায় পুরো শরীর নামাযের ক্ষেত্রে সতর। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে সতর হল নাভি থেকে হাটু পর্যন্ত।
২। পুরুষেরা আযান দেয়। অথচ মহিলাদের জন্য আযান দেওয়া জায়েয নয়।
৩। পুরুষ ইমাম ও খতীব হতে পারে। কিন্তু মহিলা ইমাম ও খতীব হতে পারে না।
৪। পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাআতে নামায আদায় করা অধিক ছাওয়াবের কারণ হয়। অথচ মহিলাদের জন্য ঘরের একেবারেই অভ্যন্তরে নামায আদায় অধিক ছাওয়াবের কারণ হয়।
৫। জুমা ও ঈদ পুরুষের জন্য জরুরী। মহিলার জন্য নয়।
৬। নামাযে ইমামকে কোন বিষয়ে সতর্ক করার জন্য পুরুষদেরকে তাসবীহের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর মহিলাদেরকে তাসফীক তথা হাতের দ্বারা শব্দ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।
উপরের মাসআলা গুলোতে এটা স্পষ্ট যে, নামাযের বেশ কিছু মাসআলায় নারীদেরকে পুরুষদের থেকে ভিন্ন কিছু হুকুম দেওয়া হয়েছে। আর এগুলো তাদের সতর ও পর্দার প্রতি খেয়াল রেখেই দেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে মহিলাদের নামায আদায়ের পদ্ধতিতেও তাদের সতর ও পর্দার বিষয়টি বিবেচনা করে পুরুষদের থেকে ভিন্ন কিছু হুকুম দেওয়া হয়েছে। যা হাদীস ও আসার দ্বারা প্রমাণীত।
অথচ এগুলোর প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই বর্তমানে একদল লোককে দেখা যায় যারা পুরুষ ও মহিলার মাঝে নামাযের পার্থক্যকে অস্বীকার করেন। আমরা পর্যায়ক্রমে হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ও কর্ম এবং তাবেয়ীগণের আসার উল্লেখ করবো।
ফুকাহায়ে কেরাম যে সকল ক্ষেত্রে মহিলাদের নামাযে পদ্ধতিগত ভিন্নতার কথা বলেছেন তা নিম্নে দেওয়া হল-
দাঁড়ানো অবস্থায়
১। তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় হাত কাপড়ের ভিতর হতে বের না করা। (সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ১৬৮৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৬, ৫০৬৭)
২। তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় উভয় হাত বুক বরাবর এমনভাবে উঠানো যাতে হাতের আঙ্গুলগুলো কাধ বরাবর হয়ে যায়। (ত্বাবারানী কাবীর ২২/২৭২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৪৭১,২৪৭৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৬)
৪। হাত বুকের উপর বাঁধা। (আস-সিআয়া ২/১৫৬)
৫। দাঁড়ানো অবস্থায় হাত যথাসম্ভব শরীরের দিকে চেপে রাখা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৭)
রুকু অবস্থায়
১। রুকুতে পুরুষদের তুলনায় কম ঝুঁকা (এতটুকু পরিমান ঝুঁকবে যাতে হাত হাঁটু পর্যন্ত পৌছে যায়)। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৫৯)
৩। রুকুতে উভয় বাহু পাজরের সঙ্গে সম্পূর্ন মিলিয়ে রাখা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৯)
৪। রুকুতে উভয় হাতের আঙ্গুল সমূহ পরিপূর্ন মিলিয়ে হাঁটুর উপর স্বাভাবিকভাবে রাখা। পুরুষদের ন্যায় আঙ্গুল ফাঁক করে হাটু না ধরা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৯)
সিজদা অবস্থায়
১। কনুইসহ উভয় হাত মাটিতে মিলিয়ে রাখা। পুরুষদের ন্যায় কনুই উঁচু করে না রাখা। (মারাসীলে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৮৪; সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং ৩৩২৫)
২। উভয় রানের সাথে পেট মিলিয়ে রাখা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৯, ৫০৭২; সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং ৩৩২৪)
৩। উভয় হাতের বাহু যথাসম্ভব পাজরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৭৮)
৪। একেবারে জড়সড় ও সংকুচিত হয়ে সিজদা করা। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৮১,২৭৮২; সুনানে বাইহাক্বী , বর্ণনা নং ৩৩২৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৭১)
৫। সিজদায় ডান দিক দিয়ে উভয় পা বের করে মাটিতে বিছিয়ে রাখা এবং উভয় পায়ের আঙ্গুল সমূহ যথাসম্ভব কিবলামুখী করে রাখা। (সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং ৩০১৬, ৩৩২৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৭৭,২৭৮৩ ; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৮)
৬। এক রানের সাথে আরেক রান যথাসম্ভব মিলিয়ে রাখা। (সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং ৩০১৬, ৩৩২৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৭১)
৭। নিতম্ব যথাসম্ভব জমীনের সাথা মিলিয়ে রাখা,উঁচু না করা। (মারাসীলে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৮৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৮২)
বসা অবস্থায়
১। বাম নিতম্বের উপর বসা। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৮৩,২৭৯২; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৭৪)
২। ডান দিক দিয়ে উভয় পা বের করে দিয়ে কিবলামুখী করে মাটিতে বিছিয়ে রাখা। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৮৩,২৭৯২; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৭৪, ৫০৭৭; কিতাবুল আসার, ইমাম মুহাম্মাদ, আসার নং ২১৬)
৩। উভয় রান যাথাসম্ভব মিলিয়ে রাখা। (সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং ৩৩২৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, বর্ণনা নং ৫০৬৯, ৫০৭৭)
৪। বাম পা, ডান রান ও গোছার নিচের রাখা। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৮৩; আওজাযুল মাসালিক ২/১১৮)
৫। বৈঠকে উভয় হাতের আঙ্গুল সমূহ মিলিয়ে হাঁটু বরাবর করে রাখা। ( মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা নং ২৭৭৮)

Leave a Reply

Your email address will not be published.