প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে হেফাজতের দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি সম্পন্ন

আমাদের ইসলাম

‘বিশ্বনবীর অপমান, সইবে না রে মুসলমান’, ‘বয়কট বয়কট, ফ্রান্সের পণ্য বয়কট’, ‘ঘেরাও ঘেরাও ঘেরাও হবে, ফ্রান্সের দূতাবাস’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত ছিল রাজধানীর রাজপথ। আজ সোমবার (২ নভেম্বর) মহানবী সা.কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবমাননা করায় ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির ঢাকা মহানগরী শাখার উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেয় লাখো জনতা। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের অঞ্চল থেকে লাখো নবীপ্রেমিক, তৌহিদী জনতা জমায়েত হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। আলেম-ওলামা, মাদরাসার তালিবুল ইলমসহ লাখো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো।

বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে দূতাবাস ঘেরাওপূর্ব সমাবেশে নেতারা বক্তৃতা দেন। নেতারা মহানবী সা.কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবমাননা করায় ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা, দূতাবাস বন্ধ, রাসুলের শানে বেয়াদবির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং ফ্রান্সের সকল পণ্য বয়কটের জোর দাবি জানান।

প্রধান অতিথির ভাষণে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ‘মহানবী সা.কে নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবমাননা করায় ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করুন।’ আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওআইসি’কে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাবুনগরী বলেন, ‘দোকান থেকে ফ্রান্সের পণ্য ফেলে দেবেন, এটা আপনাদের ইমানি দায়িত্ব।’ পাশাপাশি যারা রাসুলের শানে বেয়াদরি করবে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন তিনি। ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনীর প্রতিবাদে ফ্রান্সের সঙ্গে যাবতীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন, দূতাবাস বন্ধে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামও দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ এই নেতা।

হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরীর সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, ‘আল্লাহ পাকের হাবিবের সাথে বেয়াদবি হবে আর এদেশের তৌহিদি জনতা চুপ করে বসে থাকবে! দুটো একসাথে হতে পারে না। যতদিন এর প্রতিকার না হবে আমাদের আন্দোলন চলতেই থাকবে। এ আন্দোলন থামবে না। ইনশাআল্লাহ!’

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘নবীর ইজ্জত পুরো বিশ্বের মুসলিমদের চেয়ে দামি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে ক্ষমা না চাইলে এর চেয়েও ভয়াবহ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা ও তাদের বয়কট করা মুসলিমদের ঈমানি দায়িত্ব।’

ফ্রান্স সরকার মুসলিমদের কাছে ক্ষমা না চাইলে কাফন পরে রাস্তায় নামার হুঁশিয়ারি দেন হেফাজত নেতা আল্লামা জুনায়েদ আল হাবিব। এ সময় নবীপ্রেমিক তৌহিদি জনতা হাত তুলে এই আন্দোলনে নামতে ওয়াদাবদ্ধ হন।

হাজী শরিয়াতুল্লাহর সপ্তম পুরুষ পীর আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ হাসান বলেন, ‘ফ্রান্স সরকার তার কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে না এলে এবং মুসলিমদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে অচিরেই হাজী শরিয়াতুল্লাহর কেল্লা থেকে আবারও যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে।’

বায়তুল মোকাররম জমায়েত পূর্ব অনুষ্ঠানে মাওলানা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করুন। এর জন্য যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের ওপর কোনো অবরোধ আরোপ করতে চায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করুন। এতে অর্থনীতি যদি ধস নামে তাহলে আমরা পেটে পাথর বেঁধে জীবন ধারণ করবো। তিনবেলার পরিবর্তে একবেলা আহার গ্রহণ করবো। আর গ্রহণ করতে না পারি, নবীর ইজ্জত বক্ষে ধারণ করে জীবন দেয়াকে নিজেদের জন্য গৌরব মনে করবো। আমরা অসভ্য ম্যাক্রোঁর কোনো দূতাবাস বাংলাদেশে দেখতে চাই না। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে স্পষ্ট পয়গাম পৌঁছে দিন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের কার্যক্রম মসজিদে শহর ঢাকায় বন্ধ করে দিন।’

নেতাদের বক্তব্যের পর দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে মিছিল শুরু হয়। ফ্রান্স দূতাবাসের দিকে যাত্রা করে তৌহিদি জনতার স্রোত।

মিছিল শুরুর সময় বায়তুল মোকাররমে উপস্থিত আওয়ার ইসলাম প্রতিনিধি জানান, দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর্যন্ত মিছিলের সারি ছুটে চলছিল ফ্রান্স দূতাবাস অভিমুখে। এ সময় হেফাজত নেতারা একটি মিনি ট্রাকে চড়ে বসেন। প্রধান অতিথি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সেখানে ছিলেন।

ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাওয়ের লক্ষে গণমিছিল ছুটে চলতে থাকে রাজধানীর গুলশান-বারিধারা এলাকার দিকে। তৌহিদি জনতার মিছিলটি পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইল মোড় পেরিয়ে শান্তিনগর পর্যন্ত এলে পুলিশ প্রথম বাধা দেয়। নবীপ্রেমিক জনতা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যেতে থাকে সামনে। মালিবাগ মোড়ে এলে আবারো বাধার মুখে পড়ে মিছিলটি। হেফাজত নেতারা পুলিশের অনুরোধে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত গিয়ে যাত্রা সমাপ্ত করেন।

এ সময় সমাপনী বক্তব্য দেন আজকের ঘেরাও কর্মসূচির প্রধান অতিথি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী।

ঘেরাও কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন, বেফাক সহ-সভাপতি মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদি, নন্দিত মুফাসসির মাওলানা খুরশেদ আলম কাসেমী, জমিয়ত নেতা মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন নেতা মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, ড. আহমদ আবদুল কাদের, মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, জমিয়ত নেতা মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা জালাল আহমেদ, মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা হাসান জামিল, মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী, মাওলানা জয়নাল আবেদীন, মাওলানা গাজী ইয়াকুব প্রমূখ।

প্রসঙ্গত, স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাক-স্বাধীনতার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটি হজরত মুহাম্মদ সা.-এর কার্টুন প্রদর্শন করেন। এ ঘটনার পর ১৬ অক্টোবর ১৮ বছর বয়সী এক চেচেন কিশোর স্যামুয়েলকে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করেন।

স্যামুয়েল হত্যাকাণ্ডের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং হজরত মুহাম্মদ সা.-এর কার্টুন প্রদর্শনী অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। এ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। তৈরি হয় মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া। ইসলামের প্রতি এমন মানসিকতার জন্য ম্যাক্রোঁর মানসিক চিকিৎসা দরকার বলে মন্তব্য করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান।

ফ্রান্সের পণ্য বর্জন এবং দেশে দেশে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার ম্যাক্রোঁ আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি মুসলমানদের অনুভূতি অনুধাবন করেছেন বলে জানালেও কার্টুন প্রদর্শনীর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেননি। সূত্র: আওয়ার ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.