মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী

ভিন্ন খবর

Day

Night


বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। মশা এতটাই বেড়েছে যে, কয়েল, স্প্রে, ইলেকট্রিক ব্যাট কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। কোনো এলাকায় মশারি টানানোর পরও কয়েল জ্বালাতে হচ্ছে। আবার কোথাও দিনে-দুপুরেও মশা তাড়াতে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে। নগরবাসী অসহায়ের মতো পরিণত হচ্ছে মশার খাবারে। কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ দরকার সেসব ক্ষেত্রে দুই সিটি করপোরেশনের দুর্বলতা রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদন করা গেলে মশার উপদ্রব এত বৃদ্ধি পেত না। তবে সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র নগরে মশক নিধনে চলমান নানা কর্মসূচির কথা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন। দাবি করেছেন, আগের বছরের তুলনায় এবার যথাযথভাবে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। জানা যায়, ঢাকা শহরের সর্বত্রই এখন কিউলেক্স মশার মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রব। পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, হাজারীবাগ, পোস্তগোলা, ডেমরা, শ্যামপুর, দনিয়া, পল্টনসহ অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারাও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ। দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নবগঠিত এলাকাগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। মশার প্রজনন স্থান খাল ও নর্দমা পরিষ্কার করা বা সেখানে ওষুধ প্রয়োগ নাগরিকদের পক্ষে সম্ভব নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক মশক নিধন শ্রমিকদের দিয়ে যেভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ হয়েছে, এখন তেমন কোনো তৎপরতা নেই। এ কারণে কিউলেক্স মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ব্যর্থতা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘মশার উপদ্রবে বাসায় টিকতে পারছি না। দিনে-রাতে সমানে মশার যন্ত্রণা চলে। সন্ধ্যার পর থেকে এ এলাকায় শ্বাস নিতে গেলে নাকের ভিতরও মশা ঢোকে।’ বাসাবোর নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মশার উপদ্রবে বাসা, অফিস কিংবা রাস্তাঘাট কোথাও টেকা যায় না। দিন-রাত সব সময় একই। ছোট দুটো বাচ্চা আছে। ওদের নিয়ে এ করোনাকালে মশার কামড়ে দিশাহারা অবস্থা।’ কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। এটা নগরবাসীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কিউলেক্স মশার প্রজননস্থল ডোবা-নালায় জমে থাকা পানি। দুই সিটি করপোরেশন মশা নিধনে তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করলে কিউলেক্সের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ডোবা, নালা বা জলাশয়ের পানি পচে গেলে সেখানে মশার প্রজনন ঘটে। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার ডোবা-নালাগুলোর পানি পচে যায়। আর এসব স্থানে কচুরিপানা থাকলে তা কিউলেক্স মশার প্রজননে আরও সহায়ক হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে একই চিত্র থাকে কিউলেক্স মশার উপদ্রবের। কিউলেক্স মশার প্রজননস্থলগুলো সঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে উপদ্রব কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য ডোবা, নালা বা জলাশয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। সঠিক নিয়মে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আয়তন ১০৯ দশমিক ২৫১ বর্গ কিলোমিটার। সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫টি। কিন্তু এসব ওয়ার্ডের আয়তন অনুযায়ী জনবল, মশার ওষুধ, ফগার মেশিনের সংকট আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ২৮ অক্টোবর বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে প্রতিদিন পাঁচটি করে ওয়ার্ডে জরিপ করা হচ্ছে। জরিপকারী কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এলাকার আয়তন ১৯৬ দশমিক ২২ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ড। প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ১২ জন কর্মী সকাল-বিকাল দুই শিফটে মশা মারার ওষুধ ছিটান। কিন্তু ওয়ার্ডের আয়তন অনুযায়ী লোকবল অনেক কম। এতে এক গলিতে মশার ওষুধ ছিটানো হলে ফের একই গলিতে আসতে গড়ে এক সপ্তাহ লাগে। এমন পরিস্থিতিতে মশক নিধন কর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মশাও সহনীয় পর্যায়ে আনা যায় না। এ ছাড়া কিছু মশক নিধন কর্মীর মধ্যে কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে মেয়র যেভাবে মশক নিধন করতে চান তা যথাযথভাবে হয় না।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নগরবাসীকে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত অন্যান্য রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও বাসা-বাড়িতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়েছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে মহাখালী ও আশপাশ এলাকার ৪২টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ১ হাজার ১৮৫টি বাড়ি ও স্থাপনায় এডিস মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ পাওয়া যায়। কিন্তু মশা মারার ওষুধ ছিটানোর মতো জনবল সিটি করপোরেশনে নেই।

২ ডিসেম্বর ফেসবুক লাইভে নগরের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি বলেন, ‘গত বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মশার প্রাদুর্ভাবে ডেঙ্গুজ্বর ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বছর মশার লার্ভা ধ্বংসে চিরুনি অভিযান চালিয়েছি। মশা নিধনে ফোরথ জেনারেশন ওষুধের ব্যবহার, লার্ভিসাইড, এডাল্টিসাইড ব্যবহার করছি।’ তিনি বলেন, ‘মশা নিধনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। মশার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও মনিটরিং করছি। এ কার্যক্রমে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত হতে হবে।’ সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.