মাখলূকাতের প্রতি ভালোবাসায় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি

আমাদের ইসলাম

Day

Night


ইসলাম প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সৌহার্দ্যের শিক্ষা দেয়। দেশ কাল স্থানের সীমার উর্ধ্বে উঠে, সাদা কালোর ভেদাভেদ ভুলে, আপন-পর নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও হৃদ্যতা পোষন ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। শুধু মানবপ্রেমই নয়, সৃষ্টি জগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বৃহৎ থেকে বৃহত্তম- প্রতিটি প্রাণি সিক্ত হবে আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসার পরশে- ইসলাম আমাদের এই শিক্ষাই প্রদান করে। প্রিয়তম রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, (জীবের প্রতি) দয়াকারীর উপর দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। জমিনে বসবাসকারী মাখলুকের প্রতি দয়া কর, আসমানওয়ালা তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯২৪

অন্য এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যারা মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন না। -সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযাইল, হাদীস ৬১৭২

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহ তাআ’লার পরিবার। আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তাঁর (অর্থাৎ, আল্লাহ তাআ’লার) পরিবারের প্রতি দয়া করে। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৭৪৪৮)

প্রিয়তম রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মানুষকে ভালোবাসতেন না। ভালোবাসতেন পশুপাখি। ভালোবাসতেন গাছপালা, তরুলতা ও প্রকৃতি। সকল মাখলূকাতের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অবারিত। কেবল মানবজাতি নয়, জীবজন্তুর অধিকার রক্ষায়ও তিনি ছিলেন সোচ্চার। এক দিনের ঘটনা-

রাসূলে কারিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারির খেজুর বাগানে প্রবেশ করলে হঠাৎ একটি উট দেখতে পান। উটটি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে কাঁদতে লাগলো। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক ব্যথিত হলেন। উটটির কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। এতে উটটির কান্না বন্ধ হল।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ উটের মালিক কে? এক আনসারি যুবক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমি। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ যে তোমাকে এই নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং কষ্ট দাও’। -সুনানে আবু দাউদ : ২৫৪৯

জীবজন্তু ও পশুপাখির প্রতি কোমল ব্যবহার ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত

জীবজন্তু ও পশুপাখিসহ প্রাণির প্রতি কোমল ব্যবহার ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত। পশুপাখিকে কষ্ট দেয়া নিন্দনীয় অন্যায় এবং গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের কাছে সদাচার কামনা করেন। অতএব, তোমরা যখন হত্যা করবে, দয়াশীল হয়ে হত্যা করবে; আর যখন জবাই করবে তখন দয়ার সঙ্গে জবাই করবে। তোমাদের সবাই যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার জবাইকৃত জন্তুকে কষ্টে না ফেলে’। -সহিহ মুসলিম : ১৯৫৫

এ কারণে আমাদের উচিত, পশুপাখি ও জীবজন্তুর সঙ্গে যথাসাধ্য দয়াশীল আচরণ করতে সচেষ্ট হওয়া।

পশুপাখির অঙ্গহানি করা অভিসম্পাতযোগ্য অন্যায়

হাদিসের আলোকে পশুপাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ। বর্ণিত হয়েছে- রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে প্রাণীদের অঙ্গচ্ছেদ করে।’ -বুখারি, হাদিস নং : ৫৫১৫

বিড়ালকে কষ্ট দেয়ার কারণে এক মহিলাকে জাহান্নামে যেতে হয়েছিল

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন ‘এক নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। সে অবস্থায় বিড়ালটি মারা যায়। মহিলাটি ওই কারণে জাহান্নামে গেল। কেননা সে বিড়ালটিকে খানাপিনা কিছুই দেয়নি এবং ছেড়েও দেয়নি যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতো।’ -সহিহ বুখারি : ৩৪৮২ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩২২৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩২৩৩)

প্রাণী প্রতিপালন করলে, সেগুলোর সুস্থতা ও খাবারদাবারের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব বা অত্যাবশকীয়। মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এসব বাক্শক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ -আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৫৪৮

পশু-পাখির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

পশু-পাখির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজনে ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলোকে প্রকৃতি ও পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসলাম। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে পশু-পাখির প্রসঙ্গ বিভিন্নভাবে এসেছে। বিভিন্ন প্রাণীর নামে অনেকগুলো সুরার নামকরণ করা হয়েছে কুরআনে হাকিমে। যেমন- সুরা বাকারা (গাভি), সুরা আনআম (গৃহপালিত পশু তথা, উট, গরু, বকরি ইত্যাদি), সুরা নাহল (মৌমাছি), সুরা নামল (পিপীলিকা), সুরা আনকাবুত (মাকড়সা), সুরা ফিল (হাতি) ইত্যাদি।

বস্তুতঃ এসব নামকরণ থেকে পশু-পাখির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের আরোহণের জন্যে এবং শোভার জন্যে তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি এমন জিনিস সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না। -সুরা নাহল, আয়াত: ৮

অত্র আয়াতে উপকারী প্রাণিকূল সৃষ্টির কারণ হিসেবে তাতে আরোহণ করা এবং কিছু সংখ্যককে সৌন্দর্যের প্রতীক আখ্যায়িত করা হয়েছে।

প্রাণিজগতকে পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে কুরআনে হাকিমে বলা হয়েছে,

وَمَا مِن دَآبَّةٍ فِي الأَرْضِ وَلاَ طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلاَّ أُمَمٌ أَمْثَالُكُم مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِن شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ

আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তোমাদের মতই একেকটি জাতি। আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি। অতঃপর সবাই স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত হবে। -সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮

এভাবেই ইসলামে পশু-পাখিসহ যাবতীয় প্রাণির অধিকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে

এভাবেই ইসলামে পশু-পাখিসহ যাবতীয় অন্যান্য প্রাণির অধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মানুষের উচিত এসব দিকনির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ করে চলা। অনর্থক কোনো প্রাণিকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা এবং গোটা মাখলূকাতের প্রতি সহৃদয়তার পরিচয় দিয়ে তাদের সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করা। আমার ঘরের পাশে ক্ষুধার্ত যে কুকুরটি শুয়ে আছে তাকে এক মুঠো খাবার না দিয়ে আমি ঘুমাতে যাই কি করে! তাকে এভাবে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ছেড়ে যেতে আমার অন্তরাত্মায় একটুও কাঁপন ধরে না! তাহলে আমি কেমন হৃদয়ের মানুষ হলাম! আমি যে গরুগুলো পালন করি, একেকটা আমার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শক্তি রাখে। কিন্তু , এগুলোকে আমার আয়ত্বাধীন করে দেয়া হয়েছে। এই অবলা পশু আমার কথামত না চললে কিংবা সামান্য ভুল ভ্রান্তি করলেই যদি এগুলোর ওপরে চড়াও হই, নির্মমভাবে প্রহার করি এদেরকে, আমার মানবতা, আল্লাহ তাআ’লা প্রদত্ত আমার শ্রেষ্ঠত্ব তাহলে থাকলো কোথায়?

আসুন, গোটা মাখলূকাতের প্রতি সদয় হই, তাদের অধিকার রক্ষায় মনযোগী হই

অতএব আসুন, ক্ষতিকর প্রাণি ব্যতিত সৃষ্টি জগতের ছোট বড় সকল প্রাণীর প্রতি সদয় হই, সহানুভূতিশীল হই। তাদের জন্য ভালোবাসা ও মমতা লালন করি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য্য রক্ষায় মনোযোগী হই। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার সন্তুষ্টি অর্জনের বিশ্বাস ও প্রচেষ্টাকে সদা জাগ্রত রাখি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা আমাদের তাওফিক দান করুন। সূত্র: আওয়ার ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published.