শব্দদূষণের প্রভাব এবং প্রতিকার

ভিন্ন খবর

বর্তমানে পরিবেশ দূষণের মধ্যে অন্যতম একটি দূষণ হচ্ছে শব্দদূষণ। কেননা শব্দদূষণ যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়; তেমনি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মানুষসহ জীবজন্তু, সামুদ্রিক প্রাণী, গাছপালা সবই এ শব্দদূষণের শিকার। প্রয়োজনের থেকে বেশি শব্দ নির্গত হলে তা জীবজগতের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। বিখ্যাত পরিবেশবিজ্ঞানী N. Manivasakam-এর মতে, ‘ভৌত পরিবেশে (বিশেষত বায়ু মাধ্যমে) শ্রুতিসীমা বা সহনক্ষমতা বহির্ভূত অপেক্ষাকৃত উচ্চ-তীব্রতা বা তীক্ষ্মতা সম্পন্ন শব্দের (বিশেষ করে সুরবর্জিত শব্দ বা নয়েজ) উপস্থিতিতে জীব-পরিবেশ তথা মানুষের ওপর যে অসংশোধনযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়, সেই পরিবেশ সংক্রান্ত ঘটনাকে শব্দদূষণ বলে।’ মানবজীবন ও জন্তু-জানোয়ারদের জীবনে অতিরিক্ত শব্দদূষণ যথেচ্ছভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইকের আওয়াজ, যানবাহনের আওয়াজ শব্দদূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে। নির্দিষ্ট আইন মেনে মাইক না বাজালে তা থেকে শব্দদূষণ হয়। সমুদ্রের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক জাহাজ, সামরিক জাহাজ চলাচল ও তাদের আওয়াজ শব্দদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া তৈল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের আওয়াজও শব্দদূষণের অন্যতম কারণ। যার ফলে সামুদ্রিক জীবন ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাহ্যিকভাবে শব্দদূষণ তেমন কোনো ক্ষতিকর মনে না হলেও এটি মানুষের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর।

এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের শতকরা ১০০ ভাগ লোক শব্দদূষণের শিকার। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ অনুসারে, সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি শব্দ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের গত বছরের জরিপে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে; যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি।

২০০৬ সালের শব্দদূষণ নীতিমালা অনুযায়ী, ৫ ভাগে বিভক্ত এলাকায় সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হলেও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) গবেষণায় দেখা গেছে, সব এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ সীমার থেকে দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি জটিল রোগের অন্যতম উৎস শব্দদূষণ। ক্রমাগত বাড়তে থাকা শব্দের মাত্রা আগামীতে অসুস্থ প্রজন্মের জন্ম দেবে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ভয়াবহভাবে বেড়েছে শব্দদূষণ। অনিয়ন্ত্রিত শব্দদূষণে বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অসুস্থ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতাকেও দায়ী করেন তারা। তারা বলছেন, শব্দদূষণ সম্পর্কে ধারণা নেই অধিকাংশ জনগণের। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সেগুলোর কোনো প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে শব্দদূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে জনগণের অসচেতনতা ও অবহেলাকেও দায়ী করেন তারা। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাবেই শব্দদূষণ মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানান।

শব্দদূষণ রোধের জন্য আমাদের দেশে অনেকগুলো আইন রয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সংস্থা শব্দদূষণ বন্ধে আদালতে একটি রিট পিটিশন করে। ২০০২ সালের ২৭ মার্চ উচ্চ আদালত হাইড্রোলিক হর্ন এবং বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী যেকোনো ধরনের হর্ন গাড়িতে সংযোজনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং গাড়িতে বাল্ব হর্ন সংযোজনের নির্দেশ প্রদান করে। এ আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও প্রচলিত আছে। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ এর ২৫, ২৭, ২৮ ধারামতে শব্দদূষণ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদন্ড ও কারাদন্ড উভয়েরই বিধান রয়েছে। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ১৩৯ এবং ১৪০ নং ধারায় নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহার ও আদেশ অমান্য করার শাস্তি হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।

১৯৯৭ সালের পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নীরব এলাকায় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবল এবং রাতে ৩৫ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবল এবং রাতে ৪০ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবল ও রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবল ও রাতে ৬০ ডেসিবল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবল ও রাতে ৭০ ডেসিবলের মধ্যে শব্দের মাত্রা থাকা বাঞ্ছনীয়। এই আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে নীরব এলাকা চিহ্নিত করা হয়। শব্দদূষণ রোধ করার জন্য সরকার হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্ত এর পরও শব্দদূষণ কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে যানজট সমস্যার পাশাপাশি শব্দদূষণ একটি মারাত্মক সমস্যা। আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা।

আসলে শরীরের এমন কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই যেটি শব্দদূষণে আক্রান্ত হয় না। তবে সাধারণভাবে আমরা দেখি, শব্দদূষণে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত হয় মানুষের কান। কানের ওপর শব্দদূষণের প্রভাব মারাত্মক। এই যে ঘরে বসে আমরা কথা বলছি, এখানে ২০ ডেসিবেল বা এর কাছাকাছি শব্দের জগতে কথা বলছি। আমরা যখন এখান থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে যাব, সেটি যদি ব্যস্ত জনপদ না হয়, তাহলে আমরা আশা করব সেখানে ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবেলের মতো শব্দ উৎপাদন হবে। কিন্তু যখন আমরা আরেকটু বড় পরিসরে যাব, অনেক বেশি মানুষের ভিড়ে যাব, এই শব্দ ৬০ ডেসিবেলের মাত্রা ছাড়িয়ে ৮০/৯০/১১০ ডেসিবলে চলে যাচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে যেটি হয়, উচ্চ শব্দে মানুষ যদি বেশি সময় ধরে থাকে, ধরেন ৬০ ডেসিবেলে একটি মানুষ যদি এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা বা এর বেশি সময় ধরে থাকে, সে সাময়িকভাবে বধির হয়ে যেতে পারে। একজন মানুষকে যদি ১০০ ডেসিবেল শব্দের মধ্যে আমরা রেখে দিই, তাহলে ১৫ মিনিটের বেশি সময় থাকলে তার শ্রবণক্ষমতা একেবারে হারিয়ে যেতে পারে। কাজেই এখন যেহেতু আমরা একটি শিল্পায়নের যুগে বসবাস করছি, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি আমরা ব্যবহার করছি এবং না জেনে, না বুঝে আমাদের তরুণ যুবারা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি গান শোনার জন্য ব্যবহার করছেন, এরা হয়তো না বুঝে অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে গান শুনছেন, এতে করে তাদের অন্তঃকর্ণে ক্ষতি হচ্ছে। যে ক্ষতিটা তারা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারছে না, কিন্তু সেই ক্ষতিটি ধীরে ধীরে তাদের শোনার ক্ষমতাকে কেড়ে নিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, একজন মানুষকে যদি আট ঘণ্টা করে ক্রমাগত ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবেল শব্দের মাঝখানে রেখে দেওয়া যায়, ছয় মাস থেকে এক বছরের মাথায় লোকটি বধির হয়ে যাবেন। একজন কর্মক্ষম মানুষ যখন বধির হয়ে যান, তিনি সমাজের কোনো কাজে লাগেন না। তিনি নিজের জন্য একটি বিড়ম্বনা, পরিবার ও সমাজের জন্য বিড়ম্বনা। কাজেই আমরা যদি একটু সচেতন হই, তাহলে খুব সহজে এ বিষয়গুলো থেকে রক্ষা পেতে পারি।

শব্দদূষণের ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা ঘটতে পারে। উচ্চশব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হৃদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। আকস্মিক উচ্চৈঃশব্দ মানবদেহে রক্তচাপ ও হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয়, মাংসপেশির সংকোচন করে এবং পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়। এ ছাড়াও শ্রবণশক্তি কমে আসে, বধির হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, মাথাব্যথা, বদহজম, অনিদ্রা, মনসংযোগ কমে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, বিরক্তিবোধ, এমনকি অস্বাভাবিক আচরণ করার মতো মনোদৈহিক নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ বিকট শব্দ যেমন যানবাহনের তীব্র হর্ন বা পটকা ফাটার আওয়াজ মানুষের শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রচন্ড চাপ দেয়। এ ধরনের শব্দের প্রভাবে সাময়িকভাবে রক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়, রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন মোটরযানের চালককে বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে যান চালাতে উৎসাহিত করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে যানবাহন থেকে বের হওয়া শব্দের ব্যাপকতা এবং তীব্রতা হ্রাসের জন্য আইন করে উন্নত প্রযুক্তির ইঞ্জিন এবং সাইলেন্সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখাটা জরুরি। তাছাড়া জনগণের মধ্যে সচেতনতা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

আপাতদৃষ্টিতে শব্দদূষণ রোধ কঠিন মনে হলেও বাস্তবে এত কঠিন নয়। এর জন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, আন্তরিকতা ও এর বাস্তবায়ন। মনে রাখা দরকার, এ দেশে পলিথিন ভয়ংকর রূপ ধারণ করার পর পলিথিন বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এ দেশের রাজধানী থেকে থ্রিহুইলার তুলে দিয়ে পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। সুতরাং এ দেশে শব্দদূষণ রোধ সম্ভব হবে না এমন কথা বলা বা শব্দদূষণ রোধ করতে না পারা অযোগ্যতা বা দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কিছু নয়। সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.