শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি বাড়ায় স্বস্তি

সংবাদ

শীতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবার বাড়ল ছুটি। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে কয়েক দফা ছুটি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কওমি মাদ্রাসা বাদে অন্যসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা ছিল। সেই সময় শেষ হওয়ার দুই দিন আগে আরো এক দফা ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা এলো।

এই ঘোষণায় স্বস্তি এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এম এ খায়ের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এর আগে বুধবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আভাস দিয়েছিলেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে ১৪ নভেম্বরের পর সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হতে পারে।

৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। করোনায় প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পঞ্চম ও অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা এবং মাধ্যমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা নেবে না সরকার। আর অষ্টমের সমাপনী এবং এসএসসি ও সমমানের ফলের ভিত্তিতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হবে। তবে চারটি শর্ত দিয়ে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরিচালনায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ও এবং এ লেভেলের পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার। করোনা পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা হলেও সরকার এরই মধ্যে অফিস-আদালত এবং সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড খুলে দিয়েছে।

অন্যদিকে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হারও আগের তুলনায় অনেক কমেছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের অন্য সবকিছুকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টা দেখা গেলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সরকার। কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকার।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির কথায়, এই মুহূর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিস্থিতি নেই ‘ছুটি বাড়ছে, বাড়াতে হবেই’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলার পেছনে কর্মকর্তারা বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো

সংক্রমণের হার কমলেও এখনো রোগী পাওয়া গেছে। শীতে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণের শঙ্কা আছে। শিশুরা আক্রান্ত হলে দায় কেউ নেবে না। অভিভাবকদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা সম্ভব হবে তা পরিষ্কার নয়। অনেক দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে আবার বন্ধ করতে হয়েছে। অনেক দেশে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা বা না খোলা নিয়ে নানা ধরনের মত আছে বাংলাদেশে যদিও এগুলো খুলে দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য কোনো মহল থেকে আসেনি। আবার সমাধান সম্পর্কে কোনো মতামত না এলেও মার্চ থেকে এগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ আছে অনেকের মধ্যে।

বাকেরগঞ্জের একজন শিক্ষক নাসিমা আক্তার বলছেন, ‘আপনি এখানে এলে দেখবেন যে মনে হবে করোনা বলে আসলে কিছু নেই। বাজার, রাস্তাঘাট সব মানুষে গিজগিজ করে। কিন্তু আবার স্কুলের কথা যখন চিন্তা করি, তখন ভাবি এত ছোটো ছোটো বাচ্চারা আসবে, যদি সমস্যা হয়ে যায়, তখন কী হবে।’

এর আগে আগস্টের শেষ দিকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বলেছিল, বাংলাদেশে এখনো স্কুল খুলে দেওয়ার মতো অবস্থা আসেনি।

কমিটির এক সভায়, যেখানে শিক্ষামন্ত্রীও যোগ দিয়েছিলেন, তাতে স্কুল না খোলার পক্ষে কয়েকটি যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) বেনজীর আহমেদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অন্তত ৩/৪ মাস আগে থেকে এ সম্পর্কিত একটি গাইডলাইন চূড়ান্ত করা দরকার যা এখনো করা যায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতেও হবে আবার সংক্রমণ যাতে না হয় সেটিও দেখতে হবে। কয়েক দিন পর পর তারিখ বাড়ালে, খোলা বা বন্ধ করা নিয়ে শিশুদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। এখানে সবাইকে আশ্বস্ত করেই স্কুল কলেজ খুলতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থার অ্যাসেসমেন্ট নেই অর্থাৎ যা রিপোর্ট হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত হয়। কোথায় কতটুকু সংক্রমণ, শহর বা গ্রামে কেমন, এগুলো বিশ্লেষণ করে ম্যাপিং করলে বোঝা যেত যে দেশজুড়ে ঝুঁকি কতটুকু বা স্কুল কলেজ খোলা ঠিক হবে কি না। স্কুল খোলার আগে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা গাইডলাইন দরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলের জন্য এই গাইডলাইন হবে আলাদা। মনে রাখতে হবে প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের জন্য যে ব্যবস্থাপনা, সেটি নিশ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবে না। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ টিম করা উচিত আগে, যারা গাইডলাইন অনুযায়ী নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রস্তুতি নেবে। একটা ফিজিক্যাল সুবিধা যেমন শিশুরা কীভাবে আসবে, স্কুলে প্রবেশের সময় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা কিংবা তাদের বসার ব্যবস্থা সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী চূড়ান্ত করতে হবে। এগুলো করতে পারলে শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানে মহড়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংক্রমণ প্রতিরোধে পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আবার এতে বুঝা যেত যে ঘাটতি কোথায়। সরকারের পক্ষেও বুঝা সহজ হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময় হয়েছে কি না। সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.