সন্তানের ভয়ে পথে পথে সস্ত্রীক কোটিপতি বাবা

সংবাদ

চার মেয়ের পর পুত্রসন্তানের জন্ম হলে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিলেন কোটিপতি এমএ হাশেম (৭৫) ও সৈয়দ নুরুন্নেছা (৬০) দম্পতি। আলালের ঘরের দুলালের মতোই লালনপালন করেন সন্তানকে।

৭০ ভরি স্বর্ণালংকার দিয়ে ৫ বছর আগে ধুমধামের সঙ্গে বিয়েও করান ছেলে মোহাম্মদকে। কিন্তু সেই সন্তানের ভয়ে ৪ মাস নিজের বাড়ির বাইরে থাকতে বাধ্য হয় পাকিস্তান আমলের বিকম পাস একসময়ের প্রভাবশালী ও বিপুল সম্পত্তির মালিক হাশেম (৭৫) দম্পতি।

সম্পত্তি লিখে না দেয়ায় সন্তান সন্ত্রাসী জড়ো করে বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর করে। হত্যার হুমকি-ধমকি দেয়া হয় জন্মদাতা মা-বাবাকে। এমন কঠিন বাস্তবতার মুখে অসহায় এই দম্পতি থানাপুলিশের সহায়তা চেয়েও ব্যর্থ হয়।

শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার পর আশ্বস্ত হন। সিএমপি কমিশনারকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনের পর তৎপর হয়ে উঠে পুলিশ। দীর্ঘ ৪ মাস পর রোববার সকালের দিকে পুলিশ এ দম্পতিকে নিজের বাড়িতে তুলে দেয়।

তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে-সকালে এ দম্পতিকে বাড়ি পৌঁছে দিলেও বিকালেই বেপরোয়া ছেলে ছুটে যায় ওই বাড়িতে এবং সেই আগের স্টাইলে হুমকি-ধমকি দেয়। এ অবস্থায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে আছেন তারা।

সন্তানের হাতে নিগৃহীত হতভাগা মা-বাবা চোখের পানি ছেড়ে বলছেন, ‘আল্লাহ যেন এমন কুলাঙ্গার সন্তান কোনো মা-বাবাকে না দেয়।’

কথা হয় বন্দর থানার ওসি নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘ওই দম্পতি রোববার দুপুরে তাদের বাড়িতে উঠেছে। আমরা প্রটেকশন দিয়েছি। শুনেছি এরপর এসে আবারও হুমকি-ধমকি দেয়া হয়েছে। অভিযুক্ত সেই ছেলেকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’

৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘বৃদ্ধ মা-বাবাকে বের করে ৪ মাস পথে পথে ঘোরানোর এ ঘটনা নজিরবিহীন। আমিসহ অন্তত দুই হাজার মানুষ গিয়ে তাদের বাড়িতে তুলে দিয়েছি। বন্দর থানার ওসি তদন্তও ছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের নিমতল এলাকায় এমএ হাশেমের বাড়ি। পাকিস্তান আমলের গ্র্যাজুয়েট এমএ হাশেম এরশাদের আমলে ৮ বছর সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডের মেম্বার ছিলেন। ৩০ বছর মহল্লার সরদার ছিলেন।

এখনও এলাকার বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি। তার স্ত্রী বাকলিয়ার ঐতিহ্যবাহী কাজেম আলী মাস্টারদের বংশধর। তাদের ৪ মেয়ে-তানজিনা আফরোজ, রোমানা আফরোজ, ফারজানা আফরোজ ও হাকিমতুন্নেছা সবাই সচ্ছল, ভালো আছেন।

এমএ হাশেমের পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে বিপুল। সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা করেও গড়েছেন সম্পদ। সারাজীবনের পরিশ্রমের ফল হিসেবে তার রয়েছে হালিশহরে ৮ গণ্ডা জমির ওপর পাকিজা টাওয়ার নামে আবাসন প্রতিষ্ঠান। নিমতলা এলাকায় রয়েছে ৫ তলা ভবন। একই এলাকায় ৫ গণ্ডা জমির ওপর রয়েছে তার দুই তলাবিশিষ্ট বাড়ি।

সেখানেই তিনি বসবাস করেন। ২০১৫ সালে মোহাম্মদকে ধূমধামের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার পর ব্যবসা করার জন্য কদমতলীতে তাকে কোটি টাকার দোকান দেন। কিন্তু বিয়ের চার মাসের মাথায় স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান মোহাম্মদ। এরপরই সব সম্পত্তি তার নামে লিখে দেয়ার জন্য মা-বাবার ওপর চাপ দিতে থাকেন। ৪ বোনের কেউ যাতে বাবার বাড়িতে আসতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে বলেন। ছেলের এমন আচরণে হতভম্ব হয়ে যান তারা।

সম্পত্তি লিখে না দেয়ায় কয়েক দফা মারতেও যান মা-বাবাকে। সমাজের সরদার হিসেবে মানুষের বিচার করে অভ্যস্ত এমএ হাশের নিজের সন্তানের এমন বেপরোয়া আচরণে দিশেহারা হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সব সম্পত্তি ট্রাস্টে দিয়ে দেয়ার জন্য একটি দলিলও করে ফেলেন। এতে ক্ষান্ত না হওয়ায় ট্রাস্টের দলিল অবলোপন করেন।

এত দিন সহ্যের মধ্যে থাকলেও ১৭ জুলাই শুক্রবার সন্ত্রাসী ভাড়া করে বাড়ি ঘেরাও করে ভাংচুর চালান এবং দরজা ভেঙে সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ঘরে আগুন দিয়ে মা-বাবাকে পুড়িয়ে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। বাড়ির বাইরে লাগানো সিসি ক্যামেরায় তাদের সব কর্মকাণ্ডই ধারণ করা আছে।

একমাত্র সন্তানের নেতৃত্বে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ঘরের মধ্যেই ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকেন। ৯৯৯-এ ফোন করা হলেও সাড়া দেয়নি পুলিশ! দিশেহারা এই দম্পতি রাত সাড়ে ৩টার দিকে তারা এক মেয়ের বাসায় গিয়ে উঠে।

এই বয়সে রোগ-শোকে জর্জরিত এ দম্পতি কখনও এই মেয়ের বাসায়, কখনও ওই মেয়ের বাসায় ৪ মাস পার করে। পুলিশ মামলা না নেয়ায় তারা ২০ জুলাই আদালতে মামলা করেন।

এদিকে পুলিশের সাড়া না পেয়ে ৭ নভেম্বর তারা ছুটে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে নিজ বাড়িতে তুলে দেয়ার ব্যাপারে তার সহায়তা চেয়ে বিস্তারিত লিখিতভাবে অবহিত করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দরখাস্তের উপরে কমিশনার (চট্টগ্রাম মেট্রো) বিষয়টি দেখুন বলে রিকমেন্ড করার পাশাপাশি সরাসরি ফোন করেন। এরপরই বন্দর থানার ওসি নিজাম উদ্দিন নড়েচড়ে বাসেন এবং সৈয়দা নুরুন্নেছার করা মামলাটি গ্রহণ করেন ৯ নভেম্বর।

ওই মামলায় পুত্র মোহাম্মদ ও পুত্রবধূ সুমাইয়াসহ তিনজনকে আসামি করা হয়। শনিবার রাতেও নগরীর নাসিরাবাদে মেয়ের বাসায় ছিলেন অসহায় এই মা-বাবা। সেখানে যুগান্তর প্রতিবেদক তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ছেলের অত্যাচার-নির্যাতন ও বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা বর্ণনা দিতেই কেঁদে ফেলেন নুরুন্নেছা।

বলেন, অসহায়ের মতো প্রাণ হাতে নিয়ে আমাদেরকে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছিল। আমি ৯৯৯তে ফোন করেছিলাম। কিন্তু পুলিশ আসেনি। থানায় মামলা করতে গেলেও তখন মামলা নেয়নি। পুত্রবধূ ঘরে আনার পর গত ৫ বছর ধরেই কেঁদে চলেছি। গত চার মাসে যা কেঁদেছি, সারাজীবনেও তত কাঁদতে হয়নি। এমন কুলাঙ্গার সন্তান যেন আল্লাহ আর কাউকে না দেন।’

এমএ হাশেম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুত্রসন্তান ঘরে আসার পর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সেই সন্তান বৃদ্ধ বয়সে আমাদের ঘরছাড়া করবে, কল্পনাও করতে পারিনি। এখন পুলিশ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং পশ্চিম নিমতলা সমাজ পরিষদের সহযোগিতায় নিজের ঘরে উঠতে পেরেছি। এজন্য সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তবে আবারও যাতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাকে হতে না হয়, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাইছি।’ সূত্র: যুগান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.