সহিহ হাদিসের নামে ধুম্রজাল থেকে বেরিয়ে আসুন

আমাদের ইসলাম হক কথা

ইসলামী জীবন বিধানের মূল ভিত্তি হচ্ছে কোরআন ও হাদিস। কোরআন মানুষের জীবন ব্যবস্থার মূলনীতি পেশ করে, আর হাদিস থেকে পাওয়া যায় সেই মূলনীতি বাস্তবায়নের কার্যকর পন্থা। কোরআন যদি ইসলামের প্রদীপ হয়ে থাকে তাহলে হাদিস হচ্ছে সেই প্রদীপের বিচ্ছুরিত আলো। তাই ইসলাম বুঝতে হলে কোরআন ও হাদীস ভালোভাবে বুঝে শক্ত করে ধরতে হবে ।

আমাদের দেশে কিছু লোক কথায় কথায় ছহিহ হাদিসের দোহাই দিয়ে ওয়াজ করেন। আমাদের জেনে নেওয়া উচিৎ সহিহ হাদিস বলতে তারা কি বুঝাতে চান।আসলে তারা হাদিসশাস্ত্রকে ধুম্রজালে ফেলে সরল মনা মুসলিম জাতিকে বিজাতীয়দের কালচারে বিভ্রান্ত করতে চান।

ছহিহ শব্দের অর্থ- ৩টি- ১.আরবী ব্যাকরণের পরিভাষায়ঃ কোন আরবী শব্দে (ক) হরফে ইল্লত (আলিফ,ওয়াও,ইয়া) না হওয়া (খ) হামজাহ না হওয়া (গ) একজাতীয় দুই হরফ একই শব্দে না হওয়া। ২. আরবী ভাষায় ছহিহ শব্দের অর্থঃ শুদ্ধ , যার বিপরীত অর্থ অশুদ্ধ বা ভুল। ৩. হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় ছহিহ হলোঃ হাদিস বর্ণনাকারীর – عدل ‘আদ্‌ল’ ও ضبط ‘যাবত’ গুণদ্বয় পূর্ণ থাকা।

عدل ‘আদ্‌ল’ অর্থ=‘আদল’ এর পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুসলিম, বিবেকী, সাবালক, দীন বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ও সুস্থ রুচির অধিকারী ব্যক্তিকে উসুলে হাদিসের পরিভাষায় ‘আদিল’ বলা হয়।

ضبط ‘যাবত’= ‘যাবত’ এর পারিভাষিক অর্থ: শায়খ বা উস্তাদ থেকে শ্রবণ করা হাদিস হ্রাস, বৃদ্ধি ও বিকৃতি ব্যতীত অপরের নিকট পৌঁছে দেওয়াই হলো ضبط।

আমাদের দেশের জন সাধারন হাদিসের পরিভাষায় ছহিহ কাকে বলে তা না জানা থাকায় এবং ছহিহ অর্থ শুদ্ধ এ অর্থটি আমাদের দেশে ব্যাপক প্রচলিত থাকায় ছহিহ হাদিস বলতে সকলেই সহজে বুঝে নেন শুদ্ধ হাদিস। যারা কথায় কথায় ছহিহ হাদিসের দোহায় দেন আর বলেন এটা ছহিহ হাদিসে আছে , এটা ছহিহ হাদিসে আছে ইত্যাদি।তাদের ধুম্রজালের কারনে সাধারণ মানুষক ২৪প্রকার হাদিসের মধ্যে কেবল একপ্রকা হাদিসকেই হাদিস বলে মানেন; আর বাকী ২৩ প্রকার হাদিসকে তারা ভ্রান্ত মনে করেন।পরিতাপের বিষয় হলো আজকাল হক্কানী ওলামেয়ে কিরামও ভ্রান্তদের দেখাদেখি ছহিহ হাদিস পরিভাষাটি ব্যবহার করে থাকেন।আমাদের উচিত তাদের পরি ভাষা বাদ দিয়ে এভাবে বলা হাদিসে আছে, হাদিসে আছে এমন বলা।

১। কাওলী হাদীস ২। ফে’লী হাদীস  ৩। তাকরিরী  হাদীস

৪।মারফু হাদীস ৫।মাওকুফ হাদীস ৬।মাকতু হাদীস

৭। মুত্তাসিল হাদীস ৮।মুনকাতি হাদীস ৯।মুয়াল্লাল হাদীস ১০।মুরসাল হাদীস

১১।শা’য হাদীস  ১২। মুয়াল্লাম হাদীস

১৩। সহীহ হাদীস  ১৪।হাসান হাদীস ১৫।যঈফ হাদীস ১৬।মওযূ হাদীস ১৭। মাতরূক হাদীস  ১৮।মুবহাম হাদীস

১৯। মুতাওয়াতির হাদীস ২০। খবরে ওয়াহিদ ২১। মাশহূর হাদীস ২২।আযীয হাদীস ২৩।গরীব হাদিস

২৪। হাদিসে কুদসী

তারা ২৪ প্রকার হাদিসের কেবল ১৩নং প্রকার হাদিস নিয়ে মাতামাতি করার কারণে বাকী ২৩প্রকার হাদিস জনসাধারনের কাছে অশুদ্ধ বলে বিবেচিত। অথচ সহিহ হাদিসের চেয়েও শক্তিশালী আরও হাদিস রয়েছে যাকে মানুষ অশুদ্ধ মনে করে।

আসুন তাহলে আমরা হাদিস বিষয়ে আরও একটু বিস্তারিত জেনে নেই।

হাদিস কি?
হাদীস আরবী শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ কথা, বানী, সংবাদ, উপদেশ ইত্যাদি।ইসলামের পরিভাষায়- রাসূল (সঃ) এর কথা,কাজ ও মৌনসমর্থন, সাহাবায়ে কিরামের কথা,কাজ ও মৌনসমর্থন। কোন কোন মুহাদ্দিস তাবেয়ীনদের কথা ও কাজ কে ‘আসার’বলে অভিহিত করেছেন। যা হাদিসের কাছাকাছি গুরুত্ব রাখে।

হাদীস সুন্নত বলতে কি বুঝায়? 
হাদিস– ব্যাপক অর্থ ধারণ করে থাকে-অর্থাৎ নবীজীর জীবনের সকল কথা,কাজ ও মৌনতা, সাহাবীদের সকল কথা,কাজ ও মৌনতাকেই ব্যাপকভাবে হাদিস বলে।

সুন্নত– যেসকল হাদীসের উপর উম্মতের আমল করা আবশ্যক সে সকল হাদীসকে আলাদাভাবে সুন্নত বলা হয়। সকল হাদিসের উপর উম্মতের আমল আবশ্যক নয়;তবে সকল সুন্নতের উপর উম্মতের আমল করা আবশ্যক। সুতরাং হাদিস বিষয়টি সুন্নত থেকে ব্যাপক অর্থ বোঝায়।এতে আরও একটি বিষয় প্রমানিত হয় যে নবীর উম্মত আহলে হাদিস হতে পারে না; নবীর উম্মত আহলে সুন্নাত হতে পারে।

হাদীসের প্রকারভেদ:
প্রাথমিকভাবে হাদীসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১. কাওলী হাদীস ২. ফে’লী হাদীস ৩. তাকরীরী হাদীস। সকল হাদীসই এই তিন ভাগে বিভক্ত। এখন জেনে নিই এই তিন প্রকারের হাদিস কাকে বলে।

১। কাওলী হাদীস: রাসূল (সঃ) এর কথামূলক বা বিবৃতি মূলক হাদিসকে কাওলী হাদীস বলে। অর্থাৎ কোন বিষয়ে রাসূল (সঃ) নিজে যা বলেছেন সেটাই হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রথম উৎস। এটাই কাওলী হাদীস।
২। ফে’লী হাদীস: কর্মমূলক হাদীস । রাসূল (সঃ) এর কাজ কর্ম চরিত্র ও আচার – আচরনের মধ্য দিয়েই ইসলামের যাবতীয় বিধি বিধান ও রীতিনীতি পরিস্ফুট হয়েছে। ফলে তার সকল কাজই শরীয়তের ভিত্তি হিসেবে গন্য। অতএব যে সকল হাদীসে রাসূল (সঃ) এর কর্মের  বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে তাকে ফে’লী হাদীস বলে।
৩। তাকরিরী  হাদীস: রাসূল (সাঃ) হতে অনুমোদন ও সমর্থন প্রাপ্ত কথা ও কাজ অর্থাৎ সাহাবীদের যে সকল কথা ও কাজে রাসূল (সাঃ) এর সম্মতি পাওয়া যায়  বা তিনি প্রতিবাদ বা নিষেধ করেন নাই  এবং যা হতে শরীয়তের দৃষ্টি ভঙ্গি জানতে পারা যায়, সেই সকল ঘটনা ও কাজের  উল্লেখিত হাদীসকে  তাকরিরী বা সমর্থনমূলক হাদীস বলে।

আরও এক প্রকার হাদিসহাদীসে কুদসী
হাদীসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  হলো হাদীসে কুদসী। এ হাদীসের মুল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে  প্রাপ্ত।আল্লাহ তার নবীকে ‘ইলহাম’ কিংবা স্বপ্নযোগে যা জানাতেন নবীজী নিজ ভাষায় তা বর্ণনা করতেন। একে বলা হয় হাদীসে কুদসী।

আল্লামা আবুল বাকা তার ‘কুল্লিয়াত’ বইতে লিখেছেন: ‘কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহর কাছ থেকে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ, আর হাদীসে কুদসীর শব্দ ও ভাষা রাসুলের। কিন্ত এর অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহর কাছ হতে রাসূল (সাঃ) ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে পেয়েছেন।

হাদীসের সনদ ভিত্তিক প্রকারভেদ:
হাদিস বর্ণনাকারীকে রাবি বলে। হাদিসের মূল কথাটুকু যে সকল রাবী পরস্পরায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌছেছে তাকে ‘সনদ’ বলে। এতে হাদীস বর্ণনাকারীর নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে। আর হাদীসের মূলকথা ও উহার শব্দ সমষ্টিকে ‘মতন’ বলে।

রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারীদের সনদের দিক থেকে হাদীস তিন প্রকার: ১। মারফু হাদীস ২। মাওকুফ হাদীস ও ৩। মাকতু হাদীস


১। মারফু হাদীস : যে হাদীসের সনদ (বর্ণনা পরস্পরা) রাসূল (সাঃ) পর্যন্ত পৌছেছে, অর্থাৎ যে সনদের ধারাবাহিকতা রাসূল (সাঃ) থেকে হাদীস গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত সুরক্ষিত আছে এবং মাঝে কোন রাবী বা  হাদীস বর্ণনাকারীর নাম বাদ পড়েনি তাকে মারফু হাদীস বলে ।

যেমন: যে সকল হাদীস এভাবে বর্ণিত হয়েছে – ”রাসূল (সাঃ) বলেছেন : ”, ” আমি রাসূল (সাঃ) কে  এভাবে করতে দেখেছি” বা কোন সাহাবী বলেছেন “আমি রাসূল (সাঃ) এর উপস্থিতিতে  এই কাজটি  করেছি কিন্তু তিনি ইহার প্রতিবাদ করেন নাই” এভাবে বর্ণিত হাদীসগুলোকে মারফু হাদীস বলে ।


২। মাওকুফ হাদীস : যে হাদীসের বর্ণনাসূত্র ঊর্দ্ধদিকে সাহাবী পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ যে সনদ সূত্রে কোন সাহাবীর কাজ, কথা বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে তাকে মাওকুফ হাদীস বলে। এর অপর নাম আসার।

৩। মাকতু হাদীস : যে হাদীসের সনদ কোন তাবেয়ীন পর্যন্ত পৌছেছে তাকে মাকতু হাদীস বলে।


রাবীদের ধারাবাহিকতার হিসেবে হাদীসের শ্রেনীভাগ:

১। মুত্তাসিল হাদীস: যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পূর্ণরুপে রক্ষিত আছে,  কোন স্তরেই কোন রাবীর নাম বাদ পড়েনি তাকে মুত্তাসিল হাদীস বলে।

২। মুনকাতি হাদীস: যে হাদীসের সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি মাঝখানে কোন এক স্তরে কোন রাবীর নাম বাদ পড়েছে তাকে মুনকাতি হাদিস বলে। আর এই বাদ পড়াকে বলা হয় ইনকিতা।

৩। মুয়াল্লাক হাদীস : সনদের ইনকিতা প্রথমদিকে হলে অর্থাৎ সাহাবীর পর এক বা একাধিক রাবীর নাম বাদ পড়লে তাকে মুয়াল্লাক হাদীস বলে।

৪। মুরসাল হাদীস : যে হাদীসের ইনকিতা শেষের দিকে রয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ সরাসরি রাসূল (সাঃ) এর নাম উল্লেখ  করে হাদীস বর্ণনা করেছেন  তাকে মুরসাল হাদীস বলে।


ত্রুটিযুক্ত বর্ণনার হাদীসের  প্রকার:


শা’য হাদীস: যে হাদীসের বর্ণনাকারী  বিশ্বস্ত কিন্ত তার চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত রাবীর বর্ণনার বিপরীত তাকে শা’য হাদীস বলে।

মুয়াল্লাম হাদীস: যে হাদীসের বর্ণনা সূত্রে এমন সূক্ষ ত্রুটি থাকে যা কেবল হাদীস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরাই পার্থক্য করতে পারেন তাকে মুয়াল্লাম হাদীস বলে।


রাবীদের গুন ও যোগ্যতার বিচাওে হাদীসের প্রকারভেদ:
সহীহ হাদীস: যে মুত্তাসিল হাদীসের সনদে উল্লেখিত প্রত্যেক রাবীই পূর্ণ আদালত ও যাবত গুন সম্পন্ন এবং হাদীসটি যাবতীয় দোষত্রুটি মুক্ত, তাকে সহীহ হাদীস বলে।


হাসান হাদীস: যে হাদীসের কোন রাবীর যাবত গুনের পরিপূর্ণতার অভাব রয়েছে তাকে হাসান হাদীস বলে।

ফিকহবিদগন সাধারণত সহীহ ও হাসান হাদীসের ভিত্তিতে আইন প্রনয়ন করেন।


যঈফ হাদীস: যে হাদীসের কোন রাবী হাসান হাদীসের রাবীর গুনসম্পন্ন নয় তাকে যঈফ হাদীস বলে। রাবীর দুর্বলতার কারনেই হাদীসটিকে দূর্বল বলা হয়, অন্যথায় (নাউযুবিল্লাহ) মহানবী (সাঃ) এর কোন কথাই যঈফ নয়।


মওযূ হাদীস : যে হাদীসে রাবী জীবনে কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা কথা রচনা করেছেন বলে প্রমানিত হয়েছে তার বর্ণিত হাদীসকে মাওযু হাদীস বলে। এরুপ ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস গ্রহনযোগ্য নয় ।


মাতরূক হাদীস: যে হাদীসের রাবী হাদীসের ক্ষেত্রে  নয়; বরং সাধারন কাজ কর্মে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহন করে বলে খ্যাত, তার বর্ণিত হাদীসকে মাতরুক হাদীস বলে। এরুপ ব্যাক্তির বর্ণিত হাদীসও পরিত্যাজ্য ।


মুবহাম হাদীস: যে হাদীসের রাবীর উত্তমরুপে পরিচয় পাওয়া যায়নি যার ভিত্তিতে তার দোষ গুন বিচার করা যেতে পারে, এরুপ রাবীর বর্ণিত হাদীসকে মুবহাম হাদীস বলে। এই ব্যাক্তি সাহাবী না হলে তার হাদীস ও গ্রহনযোগ্য নয় ।


রাবীর সংখ্যা হিসেবে হাদীসের প্রকারভেদ :
মুতাওয়াতির হাদীস: যে সহীহ হাদীস প্রত্যেক যুগে এতো অধিক সংখ্যক লোকে বর্ণনা করেছেন, যাদের পক্ষে মিথ্যার জন্য দলবদ্ধ হওয়া সাধারণত অসম্ভব তাকে মুতাওয়াতির হাদীস বলে। এই ধরনের হাদীস দ্বারা নিশ্চিত জ্ঞান লাভ হয়।


খবরে ওয়াহিদ : প্রত্যেক যুগে এক, দুই বা তিন জন রাবী কতৃক বর্ণিত হাদীসকে খবরে ওয়াহিদ বা আখবারুল আহাদ বলে। এই হাদীস তিন প্রকার-

(ক) মাশহূর হাদীস: যে সহীহ হাদীসে প্রত্যেক যুগে অন্তত পক্ষে তিন জন রাবী বর্ণনা করেছেন তাকে মাশহূর হাদীস বলে।


(খ) আযীয হাদীস: যে সহীহ হাদীস প্রত্যেক যুগে অন্তত দুই জন রাবী বর্ণনা করেছেন তাকে আযীয হাদীস বলে।


(গ) গরীব হাদীস: যে সহীহ হাদীস কোন যুগে একজন মাত্র রাবী বর্ণনা করেছেন তাকে গরীব হাদীস বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.