হজ নিয়ে সৌদি মনোভাব বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার

আর্ন্তজাতিক সংবাদ

রমজান মাসের শেষের দিকে করোনা সংক্রমণ কমতে থাকায় পবিত্র কাবাসহ দেশের মসজিদগুলো নামাজের জন্য খুলে দিয়েছে সৌদি সরকার। এ কারণে অনেকেই হজ নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

এমনকি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংবাদ পরিবেশন করেছে যে, বিভিন্ন দেশ থেকে ২০ শতাংশ হজযাত্রী নিয়ে সীমিত পরিসরে হজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। কিন্তু সম্প্রতি সংক্রমণ ফের বৃদ্ধি পাওয়ায় সৌদি সরকার হজ পালন নিয়ে দোটানায় রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে।

সদ্য প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ জানিয়েছিলেন, ‘১৫ জুনের মধ্যে হজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে সৌদি আরব। সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা। তারা সীমিত হজযাত্রী নিলেও আমরা প্রস্তুত। আর নিবন্ধিত প্রায় ৬৬ হাজার নিতে চাইলেও আমাদের সমস্যা নেই। তাদের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরই বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে।’ এরই মধ্যে শনিবার রাতে তিনি হঠাৎ মারা যান। ফলে হজ নিয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না।

জানতে চাইলে সৌদি আরবে বাংলাদেশের কাউন্সিলর হজ (অতিরিক্ত সচিব) মাকসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি সৌদি সরকার। রয়টার্সের নিউজের বিষয়েও সৌদি হজ মন্ত্রণালয় কিছু বলেনি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো কথা বলছে না।’

আন্তর্জাতিক কোনো কোনো গণমাধ্যম বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত সৌদি সরকার হজ বাতিল করতে পারে। আবার কোনো কোনো গণমাধ্যম বলছে, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে শর্তসাপেক্ষে বিভিন্ন দেশকে হজ পালন করতে দেয়ার পরিকল্পনা করছে সৌদি সরকার। ১৯৩২ সালে আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো হজ বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করছে সৌদি আরব।

শুক্রবার দেশটির হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এবারের হজ নিয়ে যে দুটি পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হল কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা মেনে সীমিতসংখ্যা স্থানীয়কে হজ পালনের অনুমতি দেয়া। আরেকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হল- এই বছরের হজ একেবারেই বাতিল করা। সৌদি কর্মকর্তা বলেন, সব প্রস্তাবই বিবেচনায় রয়েছে। তবে হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

এর আগে ৮ জুন ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, করোনার কারণে এবার হজের পরিসর সীমিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। হজ পালনের জন্য প্রত্যেক দেশের যে নির্ধারিত কোটা আছে তার ২০ শতাংশ এবার হজে যেতে পারবেন। সেই হিসাবে প্রতিবারের তুলনায় এবার হজের পরিসর হবে ৫ ভাগের এক ভাগ। ২ মার্চ প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সৌদি সরকার সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুতই বিধিনিষেধ জারি করে। এর মধ্যে ছিল দুই মাসব্যাপী দেশজুড়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও কারফিউ।

কিন্তু মে মাসের শেষদিকে লকডাউন শিথিল করলে দেশটিতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। টানা ছয় দিন তিন হাজারের বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। রোববার (১৪ জুন) পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ২৭ হাজার ৫৪১ জন। মৃত্যু হয়েছে ৯৭২ জনের।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ হজ প্রতিবছর পালন করা হয়। এবার চাঁদ দেখার ভিত্তিতে জুলাই মাসের শেষের দিকে হজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিবছর হজে অংশগ্রহণ করতে বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ মানুষ সৌদি আরব গমন করেন। দেশ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি হজযাত্রী সৌদি আরব গমন করেন। দেশটি থেকে প্রায় ২ লাখ মানুষ হজে অংশ নেন। তবে এবার ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশ থেকে কেউ হজে অংশ নেবেন না। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ব্রুনাই ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও এবার কেউ হজে অংশ নিচ্ছেন না। বাংলাদেশ কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন ‘হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর কেউই নাম প্রকাশ করে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তারা প্রায় অভিন্ন ভাষায় বলেছেন, সৌদি সরকারের অনুমতি পেলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এ বছর হজে হজযাত্রী পাঠাবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। তারপর ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মৃত্যুর পর হজযাত্রী পাঠানোর বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা। অন্যদিকে সৌদি আরবে কমবেশি ২৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বিভিন্ন কাজ করছেন। সৌদি সরকার নিজেদের ভঙ্গুর অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সীমিতসংখ্যক হজযাত্রী পাঠাতে বললে তা উপেক্ষা করাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে। পরিস্থিতি যাই হোক, সৌদি সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর হজে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে অনেক বাধা রয়েছে। সৌদি সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে হজের আয়োজন করবে কি না, করলে কোন দেশ থেকে কত হজযাত্রী নেবে, কী কী শর্ত দেবে, নাকি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবারের হজ আয়োজন বাতিলের ঘোষণা দেবে, সেদিকে তাকিয়ে আছে গোটা মুসলিম বিশ্ব। তিনি বলেন, ৩০ জুলাই পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এখনও সৌদি সরকার হজযাত্রীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তাদের সিদ্ধান্তের পর হজ ফ্লাইট, শর্ত মেনে সৌদি আরবে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এখনও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। অথচ আগামী ২৩ জুন থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা।

হাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সৌদি সরকার অনুমতি দিলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় হজযাত্রী পাঠাবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তার ধারণা, সৌদি সরকার শেষ পর্যন্ত এবারের হজ বাতিল করতে পারে। আর যদি সীমিত আকারে হজের আয়োজন করে, বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে হজে যাওয়ার কোটা এক লাখ ৩৭ হাজার। মোট হজযাত্রীর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৭ হাজার এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এক লাখ ২০ হাজার জনের হজ পালন করার কথা।সূত্রঃ যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published.